কামরানের ‘অন্য পরাজয়’
https://sylhetviews24.blogspot.com/2018/08/city.html
শুধু ভোটের হিসাবেই নয়, এবারের নির্বাচনে আরেকটি ক্ষেত্রে পরাজিত হয়েছেন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। সিলেটবাসীর ‘নয়ন মণি’ হিসাবে খ্যাত এ রাজনীতিবিদের খুব কাছের মানুষজনের কেউ কেউ এই ভোটের চেয়ে এই ‘অন্য পরাজয়’ নিয়ে বেশি হতাশ। আর সেই পরাজয়টা হচ্ছে রাজনৈতিক উদারতার অনন্য উদাহরণ স্থাপন করতে না পারা।
নির্বাচনে পরাজয়ের ব্যাপারটা প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল ৩০ জুলাই। দুই প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের ব্যাবধান আর স্থগিত কেন্দ্রের মোট ভোটের হিসাব জানান দিচ্ছিল সিলেটের মেয়রের চেয়ারটি আরিফের দখলেই থাকছে। সেদিন ভোটগ্রহন শেষে সার্বিক সমিকরণটি যে পর্যায়ে দাঁড়িয়েছিল, তাতে কামরানের জয়ের সম্ভাবনাটি অনেকটা পশ্চিম দিকে সুর্যদোয়ের মতো প্রায় অসম্ভব অবস্থা। আর তাই যাবতীয় বিচার বিশ্লেষণ শেষে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আরিফুল হক চৌধুরীকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি নিজেদের প্রার্থীর পরাজয়ের কারণ সম্পর্কে ছোট্ট একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন। সেটি হচ্ছে ‘সাংগঠনিক দুর্বলতা’।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের অভিনন্দন জানানোর ব্যাপারটি সিলেটের সচেতন মানুষ প্রশংসায় ভাসালেও তারা হতাশ হয়েছেন কামরানের মনোভাবে। তাদের আফসোস, রাজনৈতিক উদারতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের দারুন একটি সুযোগ হাতছাড়া করলেন সিলেটবাসীর একসময়ের এই ‘নয়ন মনি’। নিশ্চিত পরাজয় জেনেও তিনি অভিনন্দনের পথে হাঁটেন নি।
আর তাই সিলেটের সচেতন মানুষের প্রশ্ন, ভোটের এমন কঠিন সমিকরণে দাঁড়িয়ে কামরান কি ভেবেছিলেন আলাদিনের আশ্চর্য কোন প্রদীপ ঘর্ষণ শেষে সেই দৈত্যটা এসে তাঁকে জিতিয়ে দিবে? অবশ্য সিলেটের নাগরিক সমাজ শুধু কামরান নয়, তাঁর নির্বাচন পরিচালনার সাথে জড়িতদের কাজকর্মেও প্রচন্ড বিরক্ত।
যখন আবুল মাল আব্দুল মুহিত ক্রিড়া কমপ্লেক্সে স্থাপিত নির্বাচন কমিশনের কন্ট্রোলরুম থেকে একের পর এক কেন্দ্রওয়ারি ফলাফল ঘোষণা দিচ্ছিলেন কর্মকর্তারা, তখন শুরুর দিকে বেশ খোশ মেজাজেই ছিলেন সেখানে উপস্থিত কামরান ও নৌকার প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, সাবেক সাংসদ ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরীসহ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা।
কিন্তু যখন বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর ধানের শীষ নৌকাকে ছাড়িয়ে গেলো, তখন রাত সোয়া ১১টার দিকে তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে কয়েকটি কেন্দ্রে পূণঃনির্বাচনের মৌখিক দাবি জানিয়ে কন্ট্রোল রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। উপস্থিত সাংবাদিকসহ অন্যান্য সুধিজন অবাক হওয়ার পাশাপাশি মর্মাহতও হয়েছিলেন। তাদের অবাক ও মর্মাহত হওয়া পরবর্তী দিনগুলোতে সঠিক বলেই প্রমাণিত হয়েছে। কারণ, এরপর এই দাবিটি জোরালোভাবে আর তুলেন নি আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ।
এ অবস্থায় যখন সাধারণ মানুষ অপেক্ষায় দিনগুণছিলেন, এই বুঝি কামরান জনগনের রায় মেনে নিয়ে এগিয়ে থাকার জন্য আরিফকে অভিনন্দন জানালেন! কিন্তু পরবর্তী ১১ দিনেও তা আর হলোনা।
এমন কি, আরিফ শিবির থেকে যখন দুই কেন্দ্রের মৃত আর প্রবাসী মিলিয়ে সাড়ে ৩শ’র বেশি ভোটারের তালিকা প্রকাশ করা হলো এবং দেখা গেলো শতভাগ ভোট পেলেও আরিফ প্রায় দেড়শ’ ভোটে এগিয়ে থাকবেন, তখনও যথারীতি নিরব বদর উদ্দিন আহমদ কামরান।
আর প্রতিপক্ষ আরিফুল হক চৌধুরী তখন সেই তালিকা নিয়ে ছুটছেন নির্বাচন কমিশনের দফতরে দফতরে, সিলেট এবং ঢাকায়। এ অবস্থায় নানা শংকায় কেঁপে উঠছিলেন সিলেটের সর্বস্থরের মানুষ। অথচ এই শংকা আর কাঁপন দুর করতে কামরানের একটি কথাই যথেষ্ট ছিল, যা তিনি বলতে বলতে বলেছেন একেবারে অন্তিম সময়ে।
শনিবার (১১ আগস্ট) দুপুরে, ২৭নং ওয়ার্ডের হবিনন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র পরিদর্শন করতে গিয়ে। ভোটারদের সাথে কুশল বিনিময় শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেছেন, মেয়র যেই হোন না কেন, সিলেটবাসীর উন্নয়নের জন্য তাঁর সার্বিক সহযোগীতা পাবেন।
এরপর ভোট গণনা শেষে আরও বড় ব্যবধানে পরাজয় নিশ্চিতের পর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ফলাফল মেনেও যেমন নিলেন, তেমনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ এবং অভিনন্দন জানালেন। অনেকেই মনে করছেন, পিছিয়ে পড়ার যে জনরায় পেয়েছিলেন তখনও এগিয়ে থাকার জন্য আরিফকে অভিনন্দন এবং সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে এমন একটি স্ট্যাটাস দিলে সাধারণ মানুষ যেমন শংকামুক্ত থাকতে পারতেন, তেমনি রাজনৈতিক উদারতার অনন্য নজির স্থাপনের ক্ষেত্রেও তিনি এগিয়ে যেতেন কয়েক যোজন।
সিলেটবাসী কামরানকে কি দেন নি? ৩ বার কমিশনার নির্বাচিত করার পর তাকে পৌর চেয়ারম্যানের আসনে বসিয়েছেন ১বার। তারপর দুই দুইবার বসিয়েছেন মেয়রের চেয়ারে। এরমধ্যে একবার (২০০৮ সালে) জেলখানায় বন্দী থাকা অবস্থায়। তার এসব সাফল্য বিবেচনায় রেখেই তাকে বলা হয় সিলেটবাসীর ‘নয়ন মনি’। আর কি চাই তাঁর?
এমন একটি সমৃদ্ধ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার যার, তাঁর কাছ থেকে সিলেটবাসী রাজনৈতিক উদারতার উদাহরণ প্রত্যাশা করবেন নাতো করবেন কার কাছে? কামরান সেই প্রত্যাশা পুরণ করলেন বড় বেশি দেরিতে, যখন তা আর খুব একটা জরুরী ছিলনা।
আর এ কারণেই সচেতন মানুষের দুঃখ কষ্ট যাতনা ও আলোচনা-সমালোচনা। এমন কি তাকে যারা খুব পছন্দ করেন তারাও একে কামরানে আরেকটি বড় পরাজয় বলে মনে করছেন।
তবু বিলম্বে বোধোদয়ের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ। পাশাপাশি, এগিয়ে থাকার পর পুর্বসুরীর বাসায় সপরিবারে যাওয়া, কুশলাদী বিনিময়, কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্যের অনন্য নজির স্থাপন এবং পরপর দুইবার সিলেটবাসীর রায় নিজের পক্ষে নেয়ার গৌরবময় সাফল্যের জন্য অভিনন্দন সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে।

